Wednesday, 19 April 2017

কৃষ্ণচুড়া(৮) -----------------------------------

---------------------------------------------------------
অরুন সে দিন তিয়াসার সাথে তেমন কিছু কথা বলতে পারেনি,  কেবল কিছু সৌজন্যমূলক কথাবার্তা আর অবাক হয়েছিল তিয়াসার এত বড় কর্মকাণ্ড ভেবে.... সমু, ইমলী, অবসর, লেখা, আর নিজের মত একটুকরো বাড়ী,  কোথাও কোনো বিশৃঙ্খলা নেই   সবটুকু গোছানো।
অথচ তিয়াসারর সাথে অরুন শেষ পর্যন্ত সংসারটা করে  উঠতে পারলো না,  তিয়াসার এই রূপের পরিচয় অরুন সেইদিনও পেয়েছিল, কিন্তু বড্ড অসহ্য লাগতো তিয়াসার এই বড় বেশি ভালো মানুষী আর এই মহান মহান ভাবটাকে, নিজেকে ওর পাশে বড্ড ছোট মনে হত। ওর সহ্য ক্ষমতাকে ঈর্ষা হত, আর সেখান থেকে মনে হত তিয়াসা সরে যাক, অবঞ্জা আর অবহেলায় তিয়াকে বাধ্য করেছিল অরুন দূরে সরতে, পরে বহু বার মনে হয়েছে তিয়াসা অভাব কিন্তু নিজের পুরুষ স্বত্বার অহংবোধ নিজেকে তিয়াসার কাছে মাথা নিচু করতে দেয়নি, তিয়াসাকে ভুলতে চেয়ে তড়িঘড়ি স্নেহার সাথে বিয়ে করে নিজেকে ব্যেস্ত করে ফেলেছিল অরুন,    কিন্তু তিয়াসার অভাব অন্য কেউ মেটাতে পারেনি অরুনের জীবনে।
তিন্নি যখন তিয়াসারর খোঁজ পেয়েছিল দাদাকে জানিয়েছিল,  অরুন স্থির ছিল নিজের সিদ্ধান্তে তাই তিন্নিও চুপ করে গেছলো আর কখনো কিছু চেষ্টা করেনি শুধু নিজকে  তিয়াসার কাছাকাছি রেখেছে সবসময়,  তিয়াসাও তিন্নিকে স্নেহে আদোরে ভালোবাসায় টেনে নিয়েছিল কাছে। তিন্নি তিয়াসার এই সমু আর ইমলীকে যত্ন করে কাছে টেনে নেওয়াটাকেও সম্মান জানিয়েছ বরাবর।
সমু তিদিদির সামনে বসে থাকতে পারছে না, অসম্ভব চোখ জ্বলছে তিদিদির দৃড় ব্যক্তিত্ব এই সমুর দিকে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকা, সারাবাড়ির একটা কোনাও সমুকে একা থাকতে দিচ্ছে না তিদিদি, 
বাড়ির সকলকে সমুর বাড়তি মনে হচ্ছে,,  ইমলী, উজান,  মোহোর কাউকে সহ্য হচ্ছে না,  মনে হচ্ছে তিদিদি শুধুই সমুর....... এরা সকলে কেন তিদিদি আর সমুকে একা এই বাড়িটাই এই পাহাড়ের মাঝে ছেড়ে দিচ্ছে না?
আর একটা প্রশ্ন তিদিদি তার সমুকে সব কথা বলেছে সবদিন  তবে কেন এই এত্তবড় কথাটা এত্তদিন বলেনি, নাকি সমু তিদিদির ততটা ছিল না, তিদিদির আত্মজ নয় সমু....., না এই ভাবনা তিদিদির সাথে মানায়না,  ভাবাটাও পাপ,, 
তবে কেন তিদিদি এতপরে বলল তার মাথাব্যেথার কারন আর সেটাও জানতে পারতো না সমু যদি না তিদিদি সেদিন হঠাত সেন্সলেশ হয়ে না যেত,,  আর তখন থেকেই সমুর জগতে বিস্ময়ের ঘন মেঘে ঢেকে যায়।
ডক্টর  সাথে সাথে অপারেটর করার কথা বলে সমু রাজি হয়ে গিয়েও থমকে গেছিলো ডক্টর যখন বন্ড সই করতে বলেছিল , কিন্তু উপায় ছিল না,  চুক্তিনামায় সই করিয়ে তিদিদি সমুর কাছ থেকে ট্রলি করে অপারেশন থিয়েটার এর দিকে অদৃশ্য হয়ে গেছলো।  তারপর তিদিদির ঘুম ভাঙেনি চোখ খুলে সমু, ইমলীকে দেখতে চায়নি, 
পৃথিবীর বুক ফেটে একটা আগুন আকাশ পথে ধোঁয়া হয়ে গেছে আর পাহাড়ের আকাশে   অবিশ্রান্ত কান্না ঝরছিল।  সমু কাউকে তিদিদির খবর দিতে পারেনি, মোহোর এই কঠিন কাজটা সমুর হয়ে করেছিল।
সবার কাছে সময়ের ধুলোয় হয়তো তিয়াসা দেবরায় ক্রমশ আবছা হয়ে যাবে একদিন নিয়ম মেনে,
শুধু সমুর  মননের  চিন্তনের  হৃদয়ের জমির একমাত্র মালিকানা ওর সবটুকু অস্তিত্ব জুড়ে থাকা তিদিদি, আর তিদিদি তার সর্বস্বটুকু সমুকে দিয়ে এক অনন্ত যাত্রার পথে এগিয়ে গেছে।
                                                                                            ......... সমাপ্ত

Monday, 17 April 2017

কৃষ্ণচুড়া(৭)

-----------------------------------------------
ইমলীর বিয়ের সবটুকু গুছিয়ে ফেলেছে তিয়াসা,  ডক্টর উজান রায় বালুরঘাট মেডিকেল কলেজে গত তিন বছর হল জয়েন করেছে,   বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান উজান,  তিয়াসা ইমলীর এই সম্বন্ধ টা কাগজে পাত্র পাত্রির কলাম থেকেই বেছেছে,  ইমলী আর উজান সামনা সামনি বেশ কয়েকবার কথাও বলেছে,  ওদের দুজনের দুজনকে বেশ পছন্দ সেটা ওরা তিয়াসা কে জানিয়েছে,   তিয়াসা ওদের সময় নিয়ে জানাতে বলেছিল, ওরা তাই বেশ কয়েকবার দেখা করেছিল,   এছাড়া ফোনে নিয়মিত কথা বলেনিয়েছিল। 
তার পর তিয়াসাকে ওদের পছন্দের কথা জানায়।
এরপর অনেকটা সময় নিয়েছে তিয়াসা অপেক্ষা করেছে যাতে ইমলী অবেগের বসে যেন কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়, তারপর এগোনো শুরু করেছে,
ইমলীর পছন্দমত সব কেনাকাটা  সেরেছে।,  সমু তিদিদির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবটুকু সেরেছে।
আর মাত্র কয়েকদিন ইমলী শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, সমু আর তিয়াসার মন বড্ড খারাপ।
সমু ইমলীর জন্যে বিদেশী পারফিউম  নানান প্রসাধনী এনে দিয়েছে ,  ইমলী সমুর কাছে আব্দারও করে ছোটো বোনের মত, কারো বোঝার উপায় নেই যে ওরা এক মায়ের পেটের ভাই বোন নয়,
ইমলীর  একটা নতুন বায়না ছিল ওর বিয়ের আগে মোহোরদির আর সমুদাদার এনগেজমেন্ট হয়ে যাক, তাতে নাকি ওর বৌদি নননের সম্পর্কটা একটু ভালো করে এনজয় করা হবে,
সমু আর কি করবে ইমলী তো যতটা তিদিদির প্রিয় ততটাই ওর নিজেরও।
তিয়াসা আর সমু এই ইচ্ছার কথা প্রথমে তিন্নি আর দীপ্ত রায় কে জানিয়েছিল,  তারপর ওদের মারফৎ মোহোরের বাবা মায়ের কাছে,   সকলে হাসি মুখে ইমলীর এই ইচ্ছা মেনে নিয়েছিল,  আর সেই মত ইমলীর বিয়ের সাতদিন আগেই সমু আর মোহোরের  খাতায় কলমে বিয়ে সারা বা এনগেজমেন্ট হয়ে গিয়েছে,  আর মোহোরকে জোর করে ইমলী ওদের সাথেই রেখেছে ওর ইচ্ছা মোহোরদি ওর সাথেই ওকে শ্বশুর বাড়িতেও রাখতে যাবে,  আদুরী ইমলীর কথা তো মানতে বাধ্য সবাই, তাই ওর ইচ্ছে মত সবটুকু আয়োজন।
সারা বাড়িতে আলোর রোশনাই যেন পাহাড়ের মাথায় কেউ আলোর মুকুট পড়িয়েছে,  ইমলীর দিকে সময় পেলেই তিয়াসা তাকিয়ে থাকে কি অপরূপা হয়েছে,  সেই ছোট্ট মেয়েটা......,  মায়ের সাথে আসতো তিয়াসার বাড়ি,  ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো,  তিয়াসা প্রায়ই টেনে নিয়ে ছোট্ট ইমলীর চুল বেঁধে দিতো,  এইভাবে কখন যে সে নিজের হৃদয়ের সাথে ইমলীকে বেঁধে ফেলেছিল সেটা আজ আর তিয়াসার মনে নেই।
তিয়াসার কোলে যখন ইমলী মাথাটা রাখে তখন তিয়াসার নিজের ছোটো বেলার কথা মনে পড়ে,  মায়ের কথা মনে পড়ে,  মা ঘুমাবার সময় মাথায় হাত বুলিয়ে কত রাজা রানীর গল্প বলতো,   আর সেই গল্পে কোথাও না কোথাও তিয়া বলে এক রাজকুমারী থাকতো,  এই গল্প শুনতে শুনতে তিয়াও নিশ্চিন্তে ঘুমের দেশে পাড়ি দিত। এই সব ছবিগুলো বেশিদিন তিয়ার জীবনকে  রঙিন করেনি,  অজানা ঈশানী মেঘের কালো রঙ ঢেকে দিয়েছে তিয়াসার জীবন,   বারো বছর বয়সে বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছে এক এক্সিডেন্ট এ এর পর মাসির কাছে মানুষ হয়েছে,  তারপর নিজের পছন্দে বিয়ে।
আর এখন যখন ইমলী আর সমু কে পেয়েছে ওদের শৈশব ওদের বেড়ে ওঠা সবটুকুর স্বাধ যেন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে যায় তিয়াসা।
ইমলীকে আজ মনের মত সাজিয়েছে তিয়াসা  যেন নিজের ছোট্টো বেলার আদোরের পুতুল,  লাল বেনারসি লাল চেলি,   কপালে চন্দন, যেন গোধূলির রক্তিম আলোয় এক সুন্দর পৃথিবী,  একটা অপরূপ আভা ইমলীর চোখেমুখে লেগে আছে। আর কিছুক্ষণ এর মধ্যে বরবেশে উজান এসে পড়বে,   আর তিয়াসার যত্ন করে বড় করা আদোরের ইমলীকে তুলে দিতে হবে উজানের হাতে।   এই ভাবনায় ছেদ পড়লো মোহোরের ডাকে, তিদিদি চলো না সকলে  ছবি তুলছে তুমিও এসো,, আর জোর করে ইমলী, মোহোর টেনে নিয়ে গেল তিয়াসা কে,  অন্যদিক থেকে  সমু  আরো সকলে হুড় হুড় করে দল ভারি করে চলে এল  ছবি তুলতে,  তিয়াসারও আজ খুব আনন্দের দিন,  তবুও মনের মধ্যে একটা মনখারাপের ছায়া.... ইমলী চলে যাবে।   এইসব ভাবনার দোলাচলের মাঝেই বাজির শব্দ,  উজানরা এসে গেছে,  হই হই করে সকলে চিৎকার করছে বর এসেগেছে বর এসেগেছে,  তিন্নি আর দীপ্তর প্রবেশ প্রথমে, তিন্নি তিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো তিয়াসাদি তোমায় হারিয়ে ফেলেছিলাম  নিজেদের দোষে ,  আজ মোহোর আর সমুর জন্যে আবার তোমায় পেলাম, এবার হৃদয়ের সাথে গিঁট বেঁধে রাখলাম জন্মান্তরের অংগিকারে,  তিয়াসা হেসে  সকলকে অভ্যর্থনা জানালো,  ভিড়ের মাঝে একজোড়া চোখ নজরে পড়লো তিয়াসার,  একটা অসম্ভব মোচোড় বুকের ভেতোর শুরু....., অরুন  এসেছে......।

কৃষ্ণচুড়া(৬)

------------------------------------------------
অরুন যা কিছু কখনো তিয়ার জন্যে করেনি তার সবকিছু কিংবা তার থেকে অনেক বেশি এখন  স্নেহার জন্যে করে, বেড়াতে নিয়ে যাওয়া , জন্মদিনে ভালো উপহার,বিবাহবার্ষিকীতে অবাক করা উপহার, চাহিদামত সব কিছু,,
বই পড়তে স্নেহাও ভালোবাসে, তাই অরুন বাড়িতে একটা লাইব্রেরী করে দিয়েছে স্নেহার জন্যে।
অরুন স্নেহার মুখে হাসি দেখতে পায় খুব কম, কিছুতেই খুশি করতে পারেনি অরুন, খুশি খুব কম সময়ের জন্যে হলেও বেশির ভাগ সময় আকাশ ছোঁয়া চাহিদায় অরুন জেরবার।
তিন্নি দাদার মুখ দেখে বুঝতে পারে, বুঝতে পারে তিয়া আর স্নেহার তফাৎ টা, তিয়ার মধ্যে যতবেশি স্নেহ মমতা, আদোর ভালোবাসা, যত্ন, স্নেহার স্বভাবে এসব খুব কম প্রায় নেই বললেই চলে, অরুন কোহিনুর হারিয়েছে হেলায় সেটা এখন মর্মে মর্মে বুঝলেও কিছুই করার নেই সেটা তিন্নি বোঝে।
ফেব্রুয়ারিতে তিয়ার বাড়ি গিয়েছিল তিন্নি দীপ্তর  আর মোহোর সাথে ছিল, মোহোর দীপ্তর মাসতুতো বোন সবে গ্রেজুয়েসন কমপ্লিট করে এম.এ.ভর্তি হয়েছে, ওরা একদিন ছিল পাহাড় দেখার সাধে, আসলে তিয়ার সাথে সময় কাটাতে চেয়েছিল তিন্নি,  আর মোহোর আগেও এসেছে এই পাহাড় মোহোরের ভীষণ পছন্দ , আর একজন মানুষ যার টানে মোহোর এই পাহাড়ে আসে সে হল সমু /সৌম্যদেব, কি সুন্দর ব্যবহার কি সুন্দর কথাবার্তা।
সমুও তিদিদিকে কখনো কিছু লুকোয়নি তাই সমুর যে মোহোরকে ভালো লাগে সেটা তিদিদি জানে, তিদিদি তাই মোহোর এলে সমুকে মোহোরকে  সাথে নিয়ে বেড়াতে যেতে বলে,
তিয়া চায় সমু মনের মত একজন সংগি পেয়ে যাক,  সমুর জন্যে এটাই হয়তো তিয়াসার শেষ দায়িত্ব, তিন্নি আর দীপ্ত এই সম্পর্কটা সমর্থন করে, দীপ্ত তো সবচেয়ে খুশি যে সমুর মধ্যে তিয়াসা দেবরায়ের সংস্কার এটা অনেক বেশি পাওয়া। অরুন শুনেছে এই সম্পর্কের কথা, কোনো মতামত জানায়নি, স্নেহাও জানে, সেও এই বিষয়ে কিছু বলেনা।
শুধু তিয়াসার মনে একটা উচাটন সে আর কখনো অরুনের মুখোমুখি হতে চায়না, আর এই সমু আর মোহোরের সম্পর্কের পরিণতিতে অরুনএর সামনে কি তিয়াসাকে আসতে হবে! 
তিয়াসার সাথে তিন্নির এখন একটা মিস্টি সম্পর্ক,  তিন্নি বার বার নিজের বাড়ি নিয়ে যেতে চেয়েছে তিয়াসাকে, প্রত্যেক বার কোনো না কোনো অজুহাতে এড়িয়ে গেছে । ইমলী এখন তিয়ার কাছেই থাকে, মালতী দি মারা গেছে একবছরের বেশি , মাতাল বাবার কাছে ইমলী থাকতে চায়নি,  তিদিদি তার মাতাল বাবার থেকে অনেক বেশি ভরসার, আর তিয়াসা তো নিজের জীবন সমু, ইমলী, আর 'অবসর ', এর উপাসনা বিলিয়ে দিয়েছে। 
নিজের ভালোবাসায় সিঞ্চিত ঘর সংসার স্বামী, সাজানো  স্বপ্নগুলো সব মৃতুর দেশে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছিল,  আজ কাল সেই স্বপ্নর ছায়া সমু মোহোর আর ইমলী কে ঘিরে থাকে। আর জীবনের কাছে একটা অভিমান  কেবল,  কেনো অরুনের মত একজন তিয়াসার জীবনে এসেছিল,  কেনো কতগুলো বছর ভুল কিছু অপেক্ষা আর ধারনায় চলে গেলো।  এই অভিমান এক এক সময় রাতের বেলা সিলিং ফুঁড়ে আকাশ ছুঁয়ে যায়, আর তখনি মাথায় অসম্ভব ব্যেথা হতে থাকে...... ডক্টর বলেছে চাপ না নিতে মাথায়, ব্রেনটিউমার জানান দিয়েছে আজ বছর পাঁচেক আগেই, ওষুধ চলছে.....সমুকে কারো হাতে গচ্ছিত না করে তিয়াসা অপারেশন করতে চায় না কারন ডক্টর বলেছেন কিছুই সেভাবে বলা যায়না এই ব্রেনটিউমার অপারেশনএর ফল কি হবে, তাই তিয়াসা জেনেশুনে রিক্স নিতে চায়নি।  সমুকে বলেছে ক্রনিক মাইগ্রেন পেন,  সমুটা বড্ড চিন্তা করে, কাজের চাপ মাঝে মাঝেই বাইরে যেতে হয় তারপর আবার যদি ওর তিদিদির চিন্তা করে তাহলে ছেলেটা এগোবে কি করে, 
তাই তিয়াসা দাঁতে দাঁত চেপে রয়েছে আর বছর দুয়েক ভগবান যেন সব ঠিক রাখে তিয়াসা শুধু এই প্রার্থনা করে। সমুর এক একটা এউ এস এ সেমিনার আর প্রমোশন, আর ইমলীর জন্যে একটা ভালো পাত্র, এইটুকুই আর তিয়াসা দেবরায়ের একটা লম্বা ছুটি মঞ্জুর।

Friday, 7 April 2017

কৃষ্ণচূড়া(৫)

----------------------------------------
-----------
সমু অফিস থেকে ফেরার পথে  সোজা তিদিদির অফিস হয়ে তিদিদিকে 'অবসর' এ
নামিয়ে দিয়ে বাড়ি ফেরে।  আজ তিদিদির একটু দেরী হবে অফিস থেকে বেরোতে,
দীপ্ত রায় এসেছে, ক্লায়েন্ট মিটিং চলছে,  অন্যদের কথা জানে না সমু তবে এই দীপ্ত রায়ের মিটিং অন্য মিটিং এর থেকে একটু বেশী সময় লাগে, সমু অনেক দিন এই অফিস এ আসে তিদিদিকে নিতে, তাই সকলে চেনে সমু বা সৌম্যদেব ঘোষ কে,  তাই বিনা বাধায় সে তিদিদির কনফারেন্স রুমে চলে যায়  আর এক কোনায় অপেক্ষা করে তিদিদির একটা হাসিমাখা চাহনির, আর ইশারায় জানানো এক্ষুনি কাজ শেষ করছি।
এই দীপ্ত রায় এলেই তিদিদি কাজের কথা ছাড়াও অন্য নানান কথা আলোচনা করে, সেগুলো আগে সমু বুঝতো না,  একদিন তিদিদি সমুকে এই দীপ্ত রায় কে কিসের টানে দীপ্ত রায়ের সাথে অন্য কিছু মানুষ এর খোঁজ খবর নেয়, সে সব খুলে বলেছে,
সমু একবার জানতে চেয়েছিল তিদিদির কি অরুন আর সংসার ছেড়ে আসায় কোনো আফসোস কাজ করে,  তিয়াসা দেবরায়  সৌম্যদেব ঘোষ কে উত্তর দিয়েছিল...... আফসোস অরুন বা সংসারের জন্য কিছু নেই, তবে  একটা প্রশ্ন কুড়ে কুড়ে খায় যে তিয়াসা এতো মানুষ চিনতে ভুল কি কিরে করেছিল, ভালোবাসা কি এতোটাই অন্ধ  যে মানুষ চেনা যায়  না।
অরুন কি আদেও তিয়াকে ভালোবেসেছিল?  একান্তের সব মুহুর্তগুলো কি একেবারেই মিথ্যে ছিল, অরুনের কি এক মুহুর্ত সেসব দিন মনে পড়েনা! অথচ তিয়ার বুকের দেরাজে সব ছবি ঝক ঝক করছে কখনো একমুহুর্ত ধুলো পড়তে দেয়নি  অরুনের সংগে কাটানো সময়গুলোকে, আর সে ভুলতেও চায়নি কক্ষনো ,   সেখানে সেপারেশন এর এক বছরের মধ্যেই অরুন দ্বিতীয় বিয়ে করেছিল এখন তার এক মেয়ে ক্লাস টুয়েলভে পড়ে।  এসব দীপ্ত রায়ের সাথে পরিচয়ের অনেক পরে তিয়া জানতে পেরেছে, সমু কে তিদিদি কখনো কিছু লুকোয়নি তাই সে সবটুকু জানে।
দীপ্ত রায় বছর খানেক পুরোনো হবার পর নিজের নতুন আর একটা অফিসে ইন্টিরিয়র এর জন্যে তিয়াসা দেবরায়কে জামশেদপুর ডেকেছিল, সেই অফিসেই তিন্নি তিয়াকে দেখে আর অবাক হয়ে যায় তারপর জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কাঁদতে শুরু করে এসব দেখে দীপ্ত রায়এর  আকাশ থেকে পড়ার মতো অবস্থা হয়েছিল,  এরপর সব কিছু খুলে বলে ছিল তিন্নিই,  তিয়াসা দেবরায় মাথা নিচু করে চুপ ছিল, দীপ্ত শুধু অবাক হয়ে বলেছিল অরুনদার কি হৃদয় বলে কিছু নেই,  আর সেই সংগে তিন্নি বার বার তিয়ার কাছে ক্ষমা চাইছিল,  একদিন বিনিসুতোর মালায় যে সংসার গাঁথা ছিল  অরুনের দ্বিতীয় বিয়ের পর তিন্নির বিয়ের কয়েক বছরের মধ্যেই সেই মালা ছিঁড়ে গেছে।  তিন্নি জানায় অরুনের দ্বিতীয় বৌ কিছুদিন একসাথে থাকার পর ওরা আলাদা ফ্ল্যাট এ চলে যায়,   ছোটদা বৌদিও অন্য জায়গায় চাকরী সুত্রে,   আর বাবা মা বাড়িতে থাকে কাজের লোক দেখাশোনা করে উনাদের। তিন্নি আফসোস করে বলেছিল সে কি করে তিয়া কে এত আঘাত করেছিল, এসব তিন্নি  তিয়া বাড়ি ছাড়ার পর পরই বুঝেছিল, যে তিয়া বৌদির মত তাকে তার মা পর্যন্ত এত যত্ন করে রাখেনি। তাই তার ভুলের ক্ষমা বার বার চেয়েছে তিয়ার কাছে।
এর পর দীপ্ত রায় যত বার দার্জিলিংএ তিয়াসা দেবরায়ের অফিসে এসেছে প্রায়ই তিন্নি এসেছে,  এখন তিন্নি তিয়াদি বলে ডাকে,  আর দীপ্ত রায় শুধু দিদি,   তিয়াসা দেবরায় কে দীপ্তর বেশ অন্যরকম লাগতো প্রথম দিকে এক তেজস্বিনী মহিলা গম্ভীর কম কথার মানুষ, অথচ একটা অদ্ভুত আকর্ষণ আছে, না চাইতেও যেন তিয়াসা দেবরায়ের সংগ ভালো লাগতো,   এরপর সময়ের সাথে সাথে যখন সম্পর্কের সুত্র খুঁজে পেল তখন দীপ্তর কাছে এসব কিছুর সাথে অসম্ভব সম্মান বেড়ে গেছে তিয়াসা দেবরায়ের।  এখন দীপ্তর মিটিং শেষ হলে তিয়াসা দেবরায় বাড়ির সকলের,  মানে অরুনের মা বাবার খবর নিতে ভোলেনা  আর বাকি খবর দীপ্ত নিজেই দিতে থাকে তাই তিয়াসা দেব রায় ওবাড়ির সব খবরের আপডেট পেয়ে যায়।
অরুন জানে যে দীপ্ত তিন্নির তিয়ার সাথে যোগাযোগ আছে। অথচ কখনো তিয়ার কথা তিন্নি বা দীপ্ত কারো কাছে তোলে না। যেন অরুনের জীবনে তিয়া বলে কেউ ছিলো না কখনওই। 
তিয়াসা দেবরায় ও চায় না অরুন কখনো ওর সামনাসামনি হোক, তবে ভুলতে চায় না তিয়া।  আর তাই তিয়ার মনের যে ঘরে অরুন ছিল সেই ঘরে আর কাউকে কখনওই দোড়গোড়া মাড়াতে দেয়নি,  এসেছিল অনেক মানুষ তিয়ার ঘরের তালা আর কখনো খোলেনি কারো জন্য।

Thursday, 6 April 2017

কৃষ্ণচূড়া (৪)

------------------------------------------------------
সৌম্যদেব ঘোষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অফ বি.এস.পি
দুবছর এই বার্নপুরের ছোট্টখাট্টো এমপ্লয় হোস্টেলের বাসিন্দা,
আর এক বছর পেরোলেই নিজের পছন্দমত জায়গায় পোস্টিং,
মন ছটফট করছে দিন কাটানো যেন অসম্ভব হচ্ছে, তিদিদি পাহাড় আর... আর সরল দুটো চোখের
জন্য
সৌম্যদেব ঘোষের,,  চেহারায় যোগ্যতায় বড় হয়েছে এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সৌম্যদেব
কিন্তু ভেতোরে ছোট্ট সমু সব সময় তিদিদির জন্য ছটফটানি, চিন্তা,আর অসম্ভব রকমের
মনকেমন এই নিয়ে দিন কাটায়।
এখন সমুর সকাল হয় তিদিদির ফোনের রিংটোনের ডাকে, সব কাজের মাঝে এই একজনমাত্র মানুষকে ভাবলেই সমু বার বার অবাক হয়,  একজন অচেনা মানুষ একটা অচেনা বাচ্ছাকে প্রায় রাস্তা থেকে তুলে এনে কি পরিমান স্নেহো যত্ন দিয়ে নিজের ছায়ায় এতো বড় করলো,  মা কে সমুর মনে পড়ে না, প্রথম দিকে বাবা কয়েকবার এসেছিলো দেখা করতে,  দেখা করার থেকে টাকার তগিদ বেশি সেটা সমু পড়ের দিকে বুঝে গেছিলো,
একবার অসম্ভব জ্বরে ঘোরে সমু মা মা বলে রাতভোর ডাকছিল, তখন
তিদিদি পরের দিন সকালে ফোনে অনেকবার মা কে নিয়ে আসতে বলেছিলো বাবা কে, কেউ আসে নি অথচ মাস শেষ হলেই টাকা নিতে বাবা আসতে বাবা কখনো ভোলেনি,  পরের দিকে তিদিদি টাকাটা মানিওর্ডার করে পাঠিয়ে দিত,  এভাবে শুধু টাকা ছাড়া সমুর কাছে মা, বাবার মুখ একেবারে আবছা,
বরং সমুর সব অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তিদিদি,  একটু একটু করে প্রতিমা যেমন মাটি দিয়ে গড়ে তেমনি তিদিদি সমু কে গড়েছে  রাত জেগে সমুর জ্বরের দিনগুলো মাথার কাছে বসে থেকে একভাবে কখনো জলপট্টি, কখনো মাথায় হাতবুলিয়ে দেওয়া,  পরীক্ষার সময় একসাথে রাত জাগা, নিজের দিকে তিদিদি কক্ষনো তাকায়নি বাড়িতে থাকলে সমু আর ইমলী, আর লেখা, কি যে এত লেখে তিদিদি  প্রথম দিকে সমু বুঝত না কত বই আর বইয়ের ওপরে চেনা নাম 'তিয়াসা দেবরায়'এর কবিতা, অবিশ্রান্ত ধারায় তিদিদি লিখে যায়  আর মাঝে মাঝে সমু আর ইমলীর দিকে চেয়ে থাকে.... কি যেন বলতে চায়,  কি অদ্ভুত সেই চাহনি যেন একটা প্রার্থনা।  সমু পরে একসময় তিদিদির লেখা পড়া শুরু করলো আর এখন তো তিদিদির বই ছাপানো হলে প্রথম যেন সমুর অধিকার, বুকে জড়িয়ে নেই যখনি তিদিদির নতুন বই হাতে পায় সমু।
রোজকার অফিস সেরে তিদিদির 'অবসর' এ যাওয়া একেবারে বাঁধাধরা,  পাহাড়ে সন্ধ্যে বেলা বৃষ্টি নামলে রাস্তায় কেউ বেরোয় না,  শুধু তিদিদি এই দিনগুলোয় যেন বেশি করে চা বাগানের একলা সন্ধ্যের হাতে হাত রেখে চলতে পছন্দ করে আর 'অবসর 'এ পৌছে যায়।
কি অসম্ভব পরিশ্রমী মানুষ পাহাড়ের যারা সমুর তিদিদি কে চেনে তারা সকলে জানে তিয়াসা দেবরায়ের কাছে কেউ কোনো সাহায্য চাইলে খালি হাতে ফিরতে হবে না,
একবার তিদিদি চাবাগানের এক শ্রমিকএর একটা বড় কোনো অসুস্থতার জন্যে নিজের একমাসের পুরো মাইনে দিয়ে দিয়েছিল,  সমু অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল তিদিদি তুমি তো আর ওই টাকা গুলো ফেরত পাবে না তাহলে দিলে কেন? সমুর তিদিদি বলেছিল জীবনের পরে টাকা, আগে নয়। সমু আর কখনো কোনো প্রশ্ন করেনি শুধু তিদিদির কর্মকাণ্ড দেখতো আর ভাবতো এই বুঝি অন্নপূর্ণার রুপ।
শুধু সমু নিজের কথাই বা কেন ভাববে ইমলীর জন্য কি না করে তিদিদি,  যদিও ইমলী সব সময় থাকে না তিদিদির বাড়িতে, ইমলী মাঝেমাঝে  ওর মায়ের কাছে চলে যায়, তবে বেশির ভাগ সময়ই তিদিদির কাছে থাকে।  আর পড়াশোনা, গান,আঁকা, সব তিদিদি। ইমলী সবচেয়ে ভাল একটা জিনিষ ও খুব ভালো আবৃতি করে আর ওর গলায় তিদিদির কবিতা অসাধারণ লাগে সমুর।
ইমলী এখন ফাস্টইয়ার এম. বি. এ,  বেংগালোরে, এসব কি তিদিদি ছাড়া সম্ভব হতো,  ইমলীর মা মালতী মাসি তিদিদিকে প্রানের থেকে বেশি ভালোবাসে, মালতীমাসির অন্য মেয়েদের জন্যেও তিদিদি যতটুকু পেরেছে করেছে,  মালতী মাসি আর তিদিদির বাড়িতে কাজ করতে পারে না বয়সের কারনেই হোক বা শারীরিক অসুস্থতার জন্যেই হোক,  এখন মালতী মাসির এক আত্মিয়া তিদিদির বাড়ি সামলায়।
সমুর আজকাল অন্য ভাবনা তাড়িয়ে বেড়ায়, তিদিদির মাথায় মাঝেমধ্যে অসম্ভব ব্যেথা হয় আর তিদিদি দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে থাকে চোখ রক্ত জবার মত লাল হয়ে যায় , আর দুচোখ বেয়ে জল পড়তে থাকে, সমু কতবার বলেছে তিদিদি বাইরে চলো ভালো ডাক্তার দেখিয়ে আসি কিন্তু তিদিদি যেতে চায়নি, শুধু বলে এখানেই অনেক ভালো ডাক্তার আছে..... আর এটা নাকি সামান্য ব্যথা কাজের চাপের ফল, রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে,  সমু ভরসা করতে পারে না তিদিদির এই কথাগুলো কে,
ভয় হয় খুব ভয়.... সমু এসব ভাবলেই চোখের সামনে সব অন্ধকার দেখে  আর ভাবে খুব তাড়াতাড়ি তিদিদির কাছে যেতে  হবে, আর এক বছর তারপর এন.জি.পি তে পোস্টিং নেবে সমু আর ওর তিদিদিকে  চোখের আড়াল হতে দেবে না কক্ষনো।

Tuesday, 4 April 2017

কৃষ্ণচুড়া(৩)

---------------------------------------------
চা বাগানের সরু রাস্তায় আজ সন্ধ্যেটা
একটু যেন বিষণ্ণতা ঢাকা,  আজ কয়েকদিন হল
একটা ব্যাপার সমু কে খুব নাড়া দিচ্ছে,
তিদিদি যেন কি একটা ভাবনা কারণেঅকারণে
আনমনা হয়ে যাচ্ছে বার বার, এই কয়েক বছরে
সমু  মা আর বাবার ভালোবাসা স্নেহ কি সেটা এতো
অনুভব করেছে যেন পুর্ব জন্মের কোন ভালো ফল
স্বরুপ তিদিদি কে পেয়েছে, আজ কয়েকদিন তিদিদির মন
আর শরীর দুটোই ভালো নেই,
অসম্ভব কাজের চাপ তো তিয়াশার রোজকার বিষয়,
তবে কি একটা কারোনে সমু আর ইমলির তিদিদির
মন বড্ড খারাপ, সমু ছোটো অনেক বছর বারো বয়স
কিন্তু ওর তিদিদিকে যেন কাঁচের মত স্বচ্ছ কিংবা পাহাড়ি নদীর মত স্বচ্ছ
জলের ধারার মতো দেখতে পায়,
তবে কেনো তিদিদিকে  পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। এক অবগুণ্ঠন আড়াল করছে ঝলমলে আলোকে।
গত সপ্তাহে তিয়াসা দেবরায় নতুন ক্লায়েন্ট মিটিং এর সময় দিপ্তর রায় এর সাথে আলাপ, কাজের কথার শেষে কফি ব্রেকে নানান কথার মাধ্যমে জানতে পারে দিপ্ত রায়  জামশেদপুরে  বাড়ি, তখনি তিয়াসার বুকের ভেতোর একটা চেনা ঝড় একটা মোচড়  অনুভূত হয়...কথা ঘুরিয়ে অন্য কথায় আসে।  দিপ্ত রায় কিন্তু নিজের কথা সময়ের ফাঁকে ঠিক বলে চলেছে,  দুদিন পর তিয়াসা দেবরায় দার্জিলিং থেকে  বালুরঘাট
ট্রাভেল করছিলো সাথে কয়েকজন ক্লায়েন্ট আর কলিগ সিমন্তীনি, 
সিমন্তীনির কাছে নানান কথায় জানতে পারে দিপ্ত রায় জামশেদপুরে রায় & রায় বড়ির জামাই,  এটা শোনার পর তিয়াসা দেবরায়ের এক অদ্ভুত আগ্রহে  জানতে চাইলো দিপ্ত রায়ের স্ত্রীর নাম... আর মিলে গেল  যা  মেলাতে চাইছিল  সে,
ছয় বছর খুব কম সময় নয়,  অনেক কিছু বদলে গেছে,  তিন্নি  অরুনের ছোটো বোন, এখন দিপ্ত রায়ের স্ত্রী তনিমা রায়,
এই কবছরে অরুন একবারমাত্র যোগাযোগ করেছিল....সেটাও ফোনের মারফৎ, বলেছিল ইচ্ছা হলে ফিরতে পার, তিয়াসা ভেবেছিল আরো কিছু বলবে অরুন,  আরো কিছুটা আশা করেছিলো ফোনটা পেয়ে, অরুন আর কোন কথা বলার বা শোনার অবকাশ দেয়নি  লাইনটা কেটে দিয়েছিলো।
এর একমাসের মধ্যেই তিয়াসা দেবরায়ের দার্জিলিং এর বাড়িতে লিগাল নোটিশ আসে,
অরুন সেপারেশন চায়, আর নোটিশে লেখাছিল টাকা নিজের ইচ্ছেমত নিতে পারো, তিয়াসা অরুন কে টাকায় মাপেনি কখনওই সেদিনও পারেনি, কোনো আর্জি ছাড়াই রাজী হয়ে গেছিলো অরুন কে মুক্তি দিতে কাগজে কলমে।
যে দিন শেষ দেখা ওদের সেদিন অরুন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল তিয়ার দিকে, এক দৃঢ় দীপ্ত একটা নারী..... অথচ এই মেয়েটাই একদিন চারদেওয়ালে গৃহীনি ছিল, আর পাঁচটা মেয়ের মত স্বামী সংসার.... আর ভাবতে পারছে না অরুন, মেলাতে পারছে না,  সেদিন তিয়া শেষবার বলেছিল ভালো থেকো সাবধানে থেকো।  অরুন তিয়ার চোখের দিকে তাকাতে পারেনি পুড়ে যাচ্ছিল কিসের এক আগুনে, বলতে পারেনি তিয়া তুমিও ভালো থেকো।
আজ এত বছর পর সেই আগুন কি নিভে গেছে!
সময় কি আবার দুর্বল করে দিচ্ছে তিয়াসা দেবরায়কে?  এত দিনেরশ্রম সবকি নিমেষে নড়ে যাচ্ছে, দিপ্ত রায়ের মুখটা কেনওই বা বার বার ভাসছে চোখের সামনে,
যত বার দিপ্ত রায়ের সাথে দেখা হচ্ছে একটা অন্য বাতাস বইছে তিয়াসা দেবরায়ের চারপাশ দিয়ে, কত ক্লায়েন্ট তো আসে জামশেদপুর থেকে এরকম কখনওই হয়নি, দিপ্তরায় জামশেদপুর থাকে শুনে থেকেই কি এক সুতোর টান তিয়াসা দেবরায় কে নাড়িয়ে দিচ্ছে। এলোমেলো ভাবনায় সব অগোছালো হচ্ছে।
,  কাজের শেষে অফিস ফেরত তিয়াসা দেবরায় একটা বৃদ্ধাশ্রমে রোজ যায়  জীবনটাকে শেষ দরজায় কেমন লাগে কতো রকমের ছবি এক একজন যাপনকারীর  হৃদয়ের দেওয়ালে,  তিয়াসা দেবরায় হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে সেই সব ছবির কোলাজ,  এই কয়েকদিন তিয়াসার এই আশ্রমে অনেকটা সময় কাটাচ্ছে, অফিস থেকে সময়ের আগেই বেরিয়ে চা বাগানের রাস্তা ধরে একা একা ভাবনাদের হাতে হাত রেখে আনমনে কখন যেন পৌছে যায় এই 'অবসর ' আশ্রমে , কিছু ভালো লাগছে না ঝড় থামাতেই হবে কিছুতেই অগোছালো হওয়া যাবে না, তাই ব্যস্ততা কে বাড়িয়ে দিয়েছে নিজের জীবনে 'অবসর ' অনেকটা সময় কাটিয়ে রাত আটটার সময় বাড়ি ফিরছে তার পর সমু আর ইমলীর সাথে স্বাভাবিক কিছু কথোপকথন আর একসাথে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার বাহানায় এই ছোট্টছোট্ট চোখগুলোর থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা, রাতভর সিলিঙ ফুঁড়ে কত কথা আকাশ ছুঁতে চায়,  আর আকাশটার বেগুনী রঙ সরিয়ে দেখতে চায় শুধু আলো আর আলো....... আরুন নয়,  এখন সামনে সমু, ইমলী, কাজ, অবসর, আর লেখা আর একটা মুক্তি। তিয়াসা দেবরায় পেছনে তাকালে যে হোঁচোট খেয়ে পড়তে হবে আর ক্ষত বিক্ষত হতে হবে। তিয়াসা দেবরায় অনেক ক্ষত সারিয়েছে নিজে নিজে তার দাগ হয়তো মুছবে না কিন্তু নতুন করে মনের দুর্বলতা আর সে যে মোটেই প্রশ্রয় দিতে নারাজ। তবুও সময় আসে নিজের ধারায় আর বয়েও যায় নিজের পথে পথিককে সেই ধারায় মিশিয়ে নিতে হয় নিজের চলাটুকু,  তিয়াসা দেবরায়ও এই দায়রার বাইরে নয়।

Saturday, 1 April 2017

কৃষ্ণচুড়া(২)

--------------------------------------
জীবনের থেকে আশ্চর্য আর কি বা হতে পারে,
যেখানে পর মুহুর্ত নতুন অধ্যায়, পাঁচ বছর
এই পাহাড়ে তিয়াসা দেবরায় একজন সফল
ইন্টিরিয়র ডিজাইনার আর কবিতার জগতের
অতি পরিচিত কবি,
জীবনের ব্যেস্ততায় রোজ ঘুম ভাঙে আজো তাই
সমু ডাকছে দিদি কি সুন্দর রোদ উঠেছে চল
না আজ পাহাড় দেখতে দেখতে চা খাই,
চোখ খুলে সমু আর ইমলি কে বিছানার পাশে
না দেখতে পেলে তিয়াসা দেবরায় মনে করে দিনের
শুরুয়াত ঠিকঠাক হল না, বছর দশেকের সমু
যেন একজন প্রাপ্তবয়স মনের মানুষ তিয়াসা দেবরায়
প্রায়ই অবাক হয় সমুর কেয়ারিং কথাবার্তা ওর
ব্যাবহার দেখে রোজ সকালে তিয়াসা দেবরায়ের অনেক
আগেই ঘুম ভাঙে সমুর,  এটা নাকি খুব ছোট
থেকেই তিনচার বছর বয়স তখনি ওর সৎ বাবা
ভোর বেলা ঘুম থেকে তুলে দিয়ে ভিক্ষা করতে
স্টেশনে রেখে যেত, আর সমু কেঁদে কেঁদে ভিক্ষা
করে বেড়াতো, দিনের শেষে সবটুকু ওর বাবা নিয়ে
বাসিভাত একটা পেঁয়াজ খেতে দিত। তিয়াসা দেবরায়
ক্লায়েন্ট মিটিং সেরে ফিরছিল চোখে ক্লান্তির
হালকা ঘুম লেগে আধবোজা চোখ, হটাত ঘুম
উড়ে গেল একটা বাচ্ছার কান্নাকাটিতে ট্রেনটা
সবে এন. জি.পি তে থেমেছে তিয়াসা দেবরায়ের
মন কেমন করে উঠলো কান্নাটা যেন ওছাড়া পৃথিবীর
আর কেউ শুনতে পাচ্ছে না... নেমে পড়লো ট্রেন
থেকে, সোজা ভিড় ঠেলে চিৎকার করে উঠলো
কি করছেন ওতো দুধের বাচ্ছা এভাবে মারছেন
মরে যাবে তো,  সামনে একটা কাঠখোট্টা বছর
পঁয়ত্রিশ এর লোক একটা বাচ্ছাকে অমানবিক
ভাবে পেটাচ্ছে, তিয়াসা দেবরায়ের চিৎকার শুনে
লোকটা ভুত দেখার মত কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকে আবার
বাচ্ছাটাকে মারতে শুরু করলো,  বাচ্ছাটা প্রথমবার
বোধহয় কাউকে দেখলো যে কিনা ওর মার খাওয়ার
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জানালো, আর এই অজানা আত্মিয়তার
কারন না জেনেই তিয়াসা দেবরায় কে জাপটে ধরে কাঁদতে থাকলো,
তিয়াসা দেবরায় অপ্রস্তুত অবস্থায় বাচ্ছাটাকে জড়িয়ে ধরলো।
কি এক অজানা স্নেহ ভর করে গেল বাচ্ছাটার ছোঁয়া পেয়ে,
এদিকে লোকটা বাচ্ছাটার হাত ধরে টানছে,
তিয়াসা দেবরায় বলল খবরদার হাত দেবেন না ওর গায়ে...
এরপর পুলিশ ডাকবো, পুলিশের কথা শুনে লোকটা
অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলতে শুরু
করলো কি করবো মেমসাহেব আমরা গরিব মানুষ
ভিক্ষা করে দুমুঠো ভাত জোগাড় করি আর এই ছেলেটা
সেই ভিক্ষার পয়সা দিয়ে রোজ রোজ পাউরুটি কিনে পয়সা
নষ্ট  করে,  বারন করলেও শোনে না ওর পেটে রাক্ষস
আছে,  সকাল বিকেল রাত তিন বেলা ওর খাবার চাই,
এই কথাগুলো কতটা তিয়াসা দেবরায়ের কানে পৌঁছেছে
জানা নেই  কোন এক ঘোরের মধ্যে থেকেই লোকটাকে জিগ্যেস
করলো বাচ্ছাটাকে আমায় দেবেন? লোকটা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো
কিছুক্ষন,  আবার তিয়াসা দেবরায় জানতে চাইলো
ওকে দেবেন আমায়?  লোকটা সম্বিত ফিরে পেল,
আর বলল কেন আপনি কি করবেন ওকে নিয়ে?
তিয়াসা দেবরায় বলল আপনি মাসে মাসে টাকা পাবেন, ওকে আমার সাথে
আমার বাড়িতে নিয়ে যাব ওর সব দায়িত্ত্ব আমার ওর খাওয়া
পরা, পড়াশোনা সব... আর আপনাকে মাসে কি দিতে হবে?
লোকটা অবাক হয়ে বলল সত্যি মামসাহেব!
তাই যদি হয় আমার কিছু লাগবে না আপনি নিয়ে জান
আমি কিচ্ছু চাই না, শুধু মাঝেমধ্যে ওকে দেখতে পেলেই হবে,
তিয়াসা দেবরায় আর কিছু চিন্তা না করে হ্যান্ডব্যেগ থেকে
হাজার পাঁচেক টাকা আর নিজের ফোন নাম্বার
আর ঠিকানা দিয়ে ছেলেটির হাত ধরে টিকিট কাউন্টারের দিকে
এগিয়ে গেল।
সমু আদোরে ভালবাসায় চার বছরের বেশি তিয়াসা দেবরায়ের ছায়ায় বেড়ে উঠছে।  আর ইমলি হল মালতিদির পাঁচনম্বর মেয়ে বয়স সাত বছর,
মালতিদি তিয়াসা দেবরায়ের সংসারের দায়ভার সামলায় বলা যায়  তিয়াসা দেবরায়ের রোজনামচার জরুরী সামিল।
মালতিদির অভাবের সংসারে এই ইমলি কে তিয়াসা দেবরায়ের খুব পছন্দ আর ইমলিরও তিয়াসা দেবরায়কে বড্ড বেশি পছন্দ, মালিতিদির সাথে আসে আর বাড়ি ফেরার নামে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়,
তাই বেশিরভাগ দিন তিয়াসা দেবরায়ের কাছেই থেকে যায়,  একরকম ইমলির দায়িত্ব ও অলিখিত চুক্তিমতে তিয়াসা দেবরায় নিয়ে নিয়েছে।