Monday, 17 April 2017

কৃষ্ণচুড়া(৭)

-----------------------------------------------
ইমলীর বিয়ের সবটুকু গুছিয়ে ফেলেছে তিয়াসা,  ডক্টর উজান রায় বালুরঘাট মেডিকেল কলেজে গত তিন বছর হল জয়েন করেছে,   বাবা মায়ের একমাত্র সন্তান উজান,  তিয়াসা ইমলীর এই সম্বন্ধ টা কাগজে পাত্র পাত্রির কলাম থেকেই বেছেছে,  ইমলী আর উজান সামনা সামনি বেশ কয়েকবার কথাও বলেছে,  ওদের দুজনের দুজনকে বেশ পছন্দ সেটা ওরা তিয়াসা কে জানিয়েছে,   তিয়াসা ওদের সময় নিয়ে জানাতে বলেছিল, ওরা তাই বেশ কয়েকবার দেখা করেছিল,   এছাড়া ফোনে নিয়মিত কথা বলেনিয়েছিল। 
তার পর তিয়াসাকে ওদের পছন্দের কথা জানায়।
এরপর অনেকটা সময় নিয়েছে তিয়াসা অপেক্ষা করেছে যাতে ইমলী অবেগের বসে যেন কোনো সিদ্ধান্ত না নেয়, তারপর এগোনো শুরু করেছে,
ইমলীর পছন্দমত সব কেনাকাটা  সেরেছে।,  সমু তিদিদির সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে সবটুকু সেরেছে।
আর মাত্র কয়েকদিন ইমলী শ্বশুরবাড়ি চলে যাবে, সমু আর তিয়াসার মন বড্ড খারাপ।
সমু ইমলীর জন্যে বিদেশী পারফিউম  নানান প্রসাধনী এনে দিয়েছে ,  ইমলী সমুর কাছে আব্দারও করে ছোটো বোনের মত, কারো বোঝার উপায় নেই যে ওরা এক মায়ের পেটের ভাই বোন নয়,
ইমলীর  একটা নতুন বায়না ছিল ওর বিয়ের আগে মোহোরদির আর সমুদাদার এনগেজমেন্ট হয়ে যাক, তাতে নাকি ওর বৌদি নননের সম্পর্কটা একটু ভালো করে এনজয় করা হবে,
সমু আর কি করবে ইমলী তো যতটা তিদিদির প্রিয় ততটাই ওর নিজেরও।
তিয়াসা আর সমু এই ইচ্ছার কথা প্রথমে তিন্নি আর দীপ্ত রায় কে জানিয়েছিল,  তারপর ওদের মারফৎ মোহোরের বাবা মায়ের কাছে,   সকলে হাসি মুখে ইমলীর এই ইচ্ছা মেনে নিয়েছিল,  আর সেই মত ইমলীর বিয়ের সাতদিন আগেই সমু আর মোহোরের  খাতায় কলমে বিয়ে সারা বা এনগেজমেন্ট হয়ে গিয়েছে,  আর মোহোরকে জোর করে ইমলী ওদের সাথেই রেখেছে ওর ইচ্ছা মোহোরদি ওর সাথেই ওকে শ্বশুর বাড়িতেও রাখতে যাবে,  আদুরী ইমলীর কথা তো মানতে বাধ্য সবাই, তাই ওর ইচ্ছে মত সবটুকু আয়োজন।
সারা বাড়িতে আলোর রোশনাই যেন পাহাড়ের মাথায় কেউ আলোর মুকুট পড়িয়েছে,  ইমলীর দিকে সময় পেলেই তিয়াসা তাকিয়ে থাকে কি অপরূপা হয়েছে,  সেই ছোট্ট মেয়েটা......,  মায়ের সাথে আসতো তিয়াসার বাড়ি,  ঝাঁকড়া চুল এলোমেলো,  তিয়াসা প্রায়ই টেনে নিয়ে ছোট্ট ইমলীর চুল বেঁধে দিতো,  এইভাবে কখন যে সে নিজের হৃদয়ের সাথে ইমলীকে বেঁধে ফেলেছিল সেটা আজ আর তিয়াসার মনে নেই।
তিয়াসার কোলে যখন ইমলী মাথাটা রাখে তখন তিয়াসার নিজের ছোটো বেলার কথা মনে পড়ে,  মায়ের কথা মনে পড়ে,  মা ঘুমাবার সময় মাথায় হাত বুলিয়ে কত রাজা রানীর গল্প বলতো,   আর সেই গল্পে কোথাও না কোথাও তিয়া বলে এক রাজকুমারী থাকতো,  এই গল্প শুনতে শুনতে তিয়াও নিশ্চিন্তে ঘুমের দেশে পাড়ি দিত। এই সব ছবিগুলো বেশিদিন তিয়ার জীবনকে  রঙিন করেনি,  অজানা ঈশানী মেঘের কালো রঙ ঢেকে দিয়েছে তিয়াসার জীবন,   বারো বছর বয়সে বাবা মা দুজনকেই হারিয়েছে এক এক্সিডেন্ট এ এর পর মাসির কাছে মানুষ হয়েছে,  তারপর নিজের পছন্দে বিয়ে।
আর এখন যখন ইমলী আর সমু কে পেয়েছে ওদের শৈশব ওদের বেড়ে ওঠা সবটুকুর স্বাধ যেন তারিয়ে তারিয়ে উপভোগ করে যায় তিয়াসা।
ইমলীকে আজ মনের মত সাজিয়েছে তিয়াসা  যেন নিজের ছোট্টো বেলার আদোরের পুতুল,  লাল বেনারসি লাল চেলি,   কপালে চন্দন, যেন গোধূলির রক্তিম আলোয় এক সুন্দর পৃথিবী,  একটা অপরূপ আভা ইমলীর চোখেমুখে লেগে আছে। আর কিছুক্ষণ এর মধ্যে বরবেশে উজান এসে পড়বে,   আর তিয়াসার যত্ন করে বড় করা আদোরের ইমলীকে তুলে দিতে হবে উজানের হাতে।   এই ভাবনায় ছেদ পড়লো মোহোরের ডাকে, তিদিদি চলো না সকলে  ছবি তুলছে তুমিও এসো,, আর জোর করে ইমলী, মোহোর টেনে নিয়ে গেল তিয়াসা কে,  অন্যদিক থেকে  সমু  আরো সকলে হুড় হুড় করে দল ভারি করে চলে এল  ছবি তুলতে,  তিয়াসারও আজ খুব আনন্দের দিন,  তবুও মনের মধ্যে একটা মনখারাপের ছায়া.... ইমলী চলে যাবে।   এইসব ভাবনার দোলাচলের মাঝেই বাজির শব্দ,  উজানরা এসে গেছে,  হই হই করে সকলে চিৎকার করছে বর এসেগেছে বর এসেগেছে,  তিন্নি আর দীপ্তর প্রবেশ প্রথমে, তিন্নি তিয়াকে জড়িয়ে ধরে বলে উঠলো তিয়াসাদি তোমায় হারিয়ে ফেলেছিলাম  নিজেদের দোষে ,  আজ মোহোর আর সমুর জন্যে আবার তোমায় পেলাম, এবার হৃদয়ের সাথে গিঁট বেঁধে রাখলাম জন্মান্তরের অংগিকারে,  তিয়াসা হেসে  সকলকে অভ্যর্থনা জানালো,  ভিড়ের মাঝে একজোড়া চোখ নজরে পড়লো তিয়াসার,  একটা অসম্ভব মোচোড় বুকের ভেতোর শুরু....., অরুন  এসেছে......।

No comments:

Post a Comment