Saturday, 1 April 2017

কৃষ্ণচুড়া(২)

--------------------------------------
জীবনের থেকে আশ্চর্য আর কি বা হতে পারে,
যেখানে পর মুহুর্ত নতুন অধ্যায়, পাঁচ বছর
এই পাহাড়ে তিয়াসা দেবরায় একজন সফল
ইন্টিরিয়র ডিজাইনার আর কবিতার জগতের
অতি পরিচিত কবি,
জীবনের ব্যেস্ততায় রোজ ঘুম ভাঙে আজো তাই
সমু ডাকছে দিদি কি সুন্দর রোদ উঠেছে চল
না আজ পাহাড় দেখতে দেখতে চা খাই,
চোখ খুলে সমু আর ইমলি কে বিছানার পাশে
না দেখতে পেলে তিয়াসা দেবরায় মনে করে দিনের
শুরুয়াত ঠিকঠাক হল না, বছর দশেকের সমু
যেন একজন প্রাপ্তবয়স মনের মানুষ তিয়াসা দেবরায়
প্রায়ই অবাক হয় সমুর কেয়ারিং কথাবার্তা ওর
ব্যাবহার দেখে রোজ সকালে তিয়াসা দেবরায়ের অনেক
আগেই ঘুম ভাঙে সমুর,  এটা নাকি খুব ছোট
থেকেই তিনচার বছর বয়স তখনি ওর সৎ বাবা
ভোর বেলা ঘুম থেকে তুলে দিয়ে ভিক্ষা করতে
স্টেশনে রেখে যেত, আর সমু কেঁদে কেঁদে ভিক্ষা
করে বেড়াতো, দিনের শেষে সবটুকু ওর বাবা নিয়ে
বাসিভাত একটা পেঁয়াজ খেতে দিত। তিয়াসা দেবরায়
ক্লায়েন্ট মিটিং সেরে ফিরছিল চোখে ক্লান্তির
হালকা ঘুম লেগে আধবোজা চোখ, হটাত ঘুম
উড়ে গেল একটা বাচ্ছার কান্নাকাটিতে ট্রেনটা
সবে এন. জি.পি তে থেমেছে তিয়াসা দেবরায়ের
মন কেমন করে উঠলো কান্নাটা যেন ওছাড়া পৃথিবীর
আর কেউ শুনতে পাচ্ছে না... নেমে পড়লো ট্রেন
থেকে, সোজা ভিড় ঠেলে চিৎকার করে উঠলো
কি করছেন ওতো দুধের বাচ্ছা এভাবে মারছেন
মরে যাবে তো,  সামনে একটা কাঠখোট্টা বছর
পঁয়ত্রিশ এর লোক একটা বাচ্ছাকে অমানবিক
ভাবে পেটাচ্ছে, তিয়াসা দেবরায়ের চিৎকার শুনে
লোকটা ভুত দেখার মত কয়েক মুহুর্ত চুপ থাকে আবার
বাচ্ছাটাকে মারতে শুরু করলো,  বাচ্ছাটা প্রথমবার
বোধহয় কাউকে দেখলো যে কিনা ওর মার খাওয়ার
বিরুদ্ধে বিদ্রোহ জানালো, আর এই অজানা আত্মিয়তার
কারন না জেনেই তিয়াসা দেবরায় কে জাপটে ধরে কাঁদতে থাকলো,
তিয়াসা দেবরায় অপ্রস্তুত অবস্থায় বাচ্ছাটাকে জড়িয়ে ধরলো।
কি এক অজানা স্নেহ ভর করে গেল বাচ্ছাটার ছোঁয়া পেয়ে,
এদিকে লোকটা বাচ্ছাটার হাত ধরে টানছে,
তিয়াসা দেবরায় বলল খবরদার হাত দেবেন না ওর গায়ে...
এরপর পুলিশ ডাকবো, পুলিশের কথা শুনে লোকটা
অদ্ভুত ভাবে তাকিয়ে হাত জোড় করে বলতে শুরু
করলো কি করবো মেমসাহেব আমরা গরিব মানুষ
ভিক্ষা করে দুমুঠো ভাত জোগাড় করি আর এই ছেলেটা
সেই ভিক্ষার পয়সা দিয়ে রোজ রোজ পাউরুটি কিনে পয়সা
নষ্ট  করে,  বারন করলেও শোনে না ওর পেটে রাক্ষস
আছে,  সকাল বিকেল রাত তিন বেলা ওর খাবার চাই,
এই কথাগুলো কতটা তিয়াসা দেবরায়ের কানে পৌঁছেছে
জানা নেই  কোন এক ঘোরের মধ্যে থেকেই লোকটাকে জিগ্যেস
করলো বাচ্ছাটাকে আমায় দেবেন? লোকটা হাঁ করে তাকিয়ে রইলো
কিছুক্ষন,  আবার তিয়াসা দেবরায় জানতে চাইলো
ওকে দেবেন আমায়?  লোকটা সম্বিত ফিরে পেল,
আর বলল কেন আপনি কি করবেন ওকে নিয়ে?
তিয়াসা দেবরায় বলল আপনি মাসে মাসে টাকা পাবেন, ওকে আমার সাথে
আমার বাড়িতে নিয়ে যাব ওর সব দায়িত্ত্ব আমার ওর খাওয়া
পরা, পড়াশোনা সব... আর আপনাকে মাসে কি দিতে হবে?
লোকটা অবাক হয়ে বলল সত্যি মামসাহেব!
তাই যদি হয় আমার কিছু লাগবে না আপনি নিয়ে জান
আমি কিচ্ছু চাই না, শুধু মাঝেমধ্যে ওকে দেখতে পেলেই হবে,
তিয়াসা দেবরায় আর কিছু চিন্তা না করে হ্যান্ডব্যেগ থেকে
হাজার পাঁচেক টাকা আর নিজের ফোন নাম্বার
আর ঠিকানা দিয়ে ছেলেটির হাত ধরে টিকিট কাউন্টারের দিকে
এগিয়ে গেল।
সমু আদোরে ভালবাসায় চার বছরের বেশি তিয়াসা দেবরায়ের ছায়ায় বেড়ে উঠছে।  আর ইমলি হল মালতিদির পাঁচনম্বর মেয়ে বয়স সাত বছর,
মালতিদি তিয়াসা দেবরায়ের সংসারের দায়ভার সামলায় বলা যায়  তিয়াসা দেবরায়ের রোজনামচার জরুরী সামিল।
মালতিদির অভাবের সংসারে এই ইমলি কে তিয়াসা দেবরায়ের খুব পছন্দ আর ইমলিরও তিয়াসা দেবরায়কে বড্ড বেশি পছন্দ, মালিতিদির সাথে আসে আর বাড়ি ফেরার নামে কান্নাকাটি জুড়ে দেয়,
তাই বেশিরভাগ দিন তিয়াসা দেবরায়ের কাছেই থেকে যায়,  একরকম ইমলির দায়িত্ব ও অলিখিত চুক্তিমতে তিয়াসা দেবরায় নিয়ে নিয়েছে।


No comments:

Post a Comment