Thursday, 6 April 2017

কৃষ্ণচূড়া (৪)

------------------------------------------------------
সৌম্যদেব ঘোষ সিভিল ইঞ্জিনিয়ার অফ বি.এস.পি
দুবছর এই বার্নপুরের ছোট্টখাট্টো এমপ্লয় হোস্টেলের বাসিন্দা,
আর এক বছর পেরোলেই নিজের পছন্দমত জায়গায় পোস্টিং,
মন ছটফট করছে দিন কাটানো যেন অসম্ভব হচ্ছে, তিদিদি পাহাড় আর... আর সরল দুটো চোখের
জন্য
সৌম্যদেব ঘোষের,,  চেহারায় যোগ্যতায় বড় হয়েছে এই সিভিল ইঞ্জিনিয়ার সৌম্যদেব
কিন্তু ভেতোরে ছোট্ট সমু সব সময় তিদিদির জন্য ছটফটানি, চিন্তা,আর অসম্ভব রকমের
মনকেমন এই নিয়ে দিন কাটায়।
এখন সমুর সকাল হয় তিদিদির ফোনের রিংটোনের ডাকে, সব কাজের মাঝে এই একজনমাত্র মানুষকে ভাবলেই সমু বার বার অবাক হয়,  একজন অচেনা মানুষ একটা অচেনা বাচ্ছাকে প্রায় রাস্তা থেকে তুলে এনে কি পরিমান স্নেহো যত্ন দিয়ে নিজের ছায়ায় এতো বড় করলো,  মা কে সমুর মনে পড়ে না, প্রথম দিকে বাবা কয়েকবার এসেছিলো দেখা করতে,  দেখা করার থেকে টাকার তগিদ বেশি সেটা সমু পড়ের দিকে বুঝে গেছিলো,
একবার অসম্ভব জ্বরে ঘোরে সমু মা মা বলে রাতভোর ডাকছিল, তখন
তিদিদি পরের দিন সকালে ফোনে অনেকবার মা কে নিয়ে আসতে বলেছিলো বাবা কে, কেউ আসে নি অথচ মাস শেষ হলেই টাকা নিতে বাবা আসতে বাবা কখনো ভোলেনি,  পরের দিকে তিদিদি টাকাটা মানিওর্ডার করে পাঠিয়ে দিত,  এভাবে শুধু টাকা ছাড়া সমুর কাছে মা, বাবার মুখ একেবারে আবছা,
বরং সমুর সব অস্তিত্ব জুড়ে শুধু তিদিদি,  একটু একটু করে প্রতিমা যেমন মাটি দিয়ে গড়ে তেমনি তিদিদি সমু কে গড়েছে  রাত জেগে সমুর জ্বরের দিনগুলো মাথার কাছে বসে থেকে একভাবে কখনো জলপট্টি, কখনো মাথায় হাতবুলিয়ে দেওয়া,  পরীক্ষার সময় একসাথে রাত জাগা, নিজের দিকে তিদিদি কক্ষনো তাকায়নি বাড়িতে থাকলে সমু আর ইমলী, আর লেখা, কি যে এত লেখে তিদিদি  প্রথম দিকে সমু বুঝত না কত বই আর বইয়ের ওপরে চেনা নাম 'তিয়াসা দেবরায়'এর কবিতা, অবিশ্রান্ত ধারায় তিদিদি লিখে যায়  আর মাঝে মাঝে সমু আর ইমলীর দিকে চেয়ে থাকে.... কি যেন বলতে চায়,  কি অদ্ভুত সেই চাহনি যেন একটা প্রার্থনা।  সমু পরে একসময় তিদিদির লেখা পড়া শুরু করলো আর এখন তো তিদিদির বই ছাপানো হলে প্রথম যেন সমুর অধিকার, বুকে জড়িয়ে নেই যখনি তিদিদির নতুন বই হাতে পায় সমু।
রোজকার অফিস সেরে তিদিদির 'অবসর' এ যাওয়া একেবারে বাঁধাধরা,  পাহাড়ে সন্ধ্যে বেলা বৃষ্টি নামলে রাস্তায় কেউ বেরোয় না,  শুধু তিদিদি এই দিনগুলোয় যেন বেশি করে চা বাগানের একলা সন্ধ্যের হাতে হাত রেখে চলতে পছন্দ করে আর 'অবসর 'এ পৌছে যায়।
কি অসম্ভব পরিশ্রমী মানুষ পাহাড়ের যারা সমুর তিদিদি কে চেনে তারা সকলে জানে তিয়াসা দেবরায়ের কাছে কেউ কোনো সাহায্য চাইলে খালি হাতে ফিরতে হবে না,
একবার তিদিদি চাবাগানের এক শ্রমিকএর একটা বড় কোনো অসুস্থতার জন্যে নিজের একমাসের পুরো মাইনে দিয়ে দিয়েছিল,  সমু অবাক হয়ে জানতে চেয়েছিল তিদিদি তুমি তো আর ওই টাকা গুলো ফেরত পাবে না তাহলে দিলে কেন? সমুর তিদিদি বলেছিল জীবনের পরে টাকা, আগে নয়। সমু আর কখনো কোনো প্রশ্ন করেনি শুধু তিদিদির কর্মকাণ্ড দেখতো আর ভাবতো এই বুঝি অন্নপূর্ণার রুপ।
শুধু সমু নিজের কথাই বা কেন ভাববে ইমলীর জন্য কি না করে তিদিদি,  যদিও ইমলী সব সময় থাকে না তিদিদির বাড়িতে, ইমলী মাঝেমাঝে  ওর মায়ের কাছে চলে যায়, তবে বেশির ভাগ সময়ই তিদিদির কাছে থাকে।  আর পড়াশোনা, গান,আঁকা, সব তিদিদি। ইমলী সবচেয়ে ভাল একটা জিনিষ ও খুব ভালো আবৃতি করে আর ওর গলায় তিদিদির কবিতা অসাধারণ লাগে সমুর।
ইমলী এখন ফাস্টইয়ার এম. বি. এ,  বেংগালোরে, এসব কি তিদিদি ছাড়া সম্ভব হতো,  ইমলীর মা মালতী মাসি তিদিদিকে প্রানের থেকে বেশি ভালোবাসে, মালতীমাসির অন্য মেয়েদের জন্যেও তিদিদি যতটুকু পেরেছে করেছে,  মালতী মাসি আর তিদিদির বাড়িতে কাজ করতে পারে না বয়সের কারনেই হোক বা শারীরিক অসুস্থতার জন্যেই হোক,  এখন মালতী মাসির এক আত্মিয়া তিদিদির বাড়ি সামলায়।
সমুর আজকাল অন্য ভাবনা তাড়িয়ে বেড়ায়, তিদিদির মাথায় মাঝেমধ্যে অসম্ভব ব্যেথা হয় আর তিদিদি দুহাত দিয়ে মাথা চেপে ধরে বসে থাকে চোখ রক্ত জবার মত লাল হয়ে যায় , আর দুচোখ বেয়ে জল পড়তে থাকে, সমু কতবার বলেছে তিদিদি বাইরে চলো ভালো ডাক্তার দেখিয়ে আসি কিন্তু তিদিদি যেতে চায়নি, শুধু বলে এখানেই অনেক ভালো ডাক্তার আছে..... আর এটা নাকি সামান্য ব্যথা কাজের চাপের ফল, রেস্ট নিলে ঠিক হয়ে যাবে,  সমু ভরসা করতে পারে না তিদিদির এই কথাগুলো কে,
ভয় হয় খুব ভয়.... সমু এসব ভাবলেই চোখের সামনে সব অন্ধকার দেখে  আর ভাবে খুব তাড়াতাড়ি তিদিদির কাছে যেতে  হবে, আর এক বছর তারপর এন.জি.পি তে পোস্টিং নেবে সমু আর ওর তিদিদিকে  চোখের আড়াল হতে দেবে না কক্ষনো।

No comments:

Post a Comment