---------------------------------------------
চা বাগানের সরু রাস্তায় আজ সন্ধ্যেটা
একটু যেন বিষণ্ণতা ঢাকা, আজ কয়েকদিন হল
একটা ব্যাপার সমু কে খুব নাড়া দিচ্ছে,
তিদিদি যেন কি একটা ভাবনা কারণেঅকারণে
আনমনা হয়ে যাচ্ছে বার বার, এই কয়েক বছরে
সমু মা আর বাবার ভালোবাসা স্নেহ কি সেটা এতো
অনুভব করেছে যেন পুর্ব জন্মের কোন ভালো ফল
স্বরুপ তিদিদি কে পেয়েছে, আজ কয়েকদিন তিদিদির মন
আর শরীর দুটোই ভালো নেই,
অসম্ভব কাজের চাপ তো তিয়াশার রোজকার বিষয়,
তবে কি একটা কারোনে সমু আর ইমলির তিদিদির
মন বড্ড খারাপ, সমু ছোটো অনেক বছর বারো বয়স
কিন্তু ওর তিদিদিকে যেন কাঁচের মত স্বচ্ছ কিংবা পাহাড়ি নদীর মত স্বচ্ছ
জলের ধারার মতো দেখতে পায়,
তবে কেনো তিদিদিকে পরিষ্কার দেখতে পাচ্ছে না। এক অবগুণ্ঠন আড়াল করছে ঝলমলে আলোকে।
গত সপ্তাহে তিয়াসা দেবরায় নতুন ক্লায়েন্ট মিটিং এর সময় দিপ্তর রায় এর সাথে আলাপ, কাজের কথার শেষে কফি ব্রেকে নানান কথার মাধ্যমে জানতে পারে দিপ্ত রায় জামশেদপুরে বাড়ি, তখনি তিয়াসার বুকের ভেতোর একটা চেনা ঝড় একটা মোচড় অনুভূত হয়...কথা ঘুরিয়ে অন্য কথায় আসে। দিপ্ত রায় কিন্তু নিজের কথা সময়ের ফাঁকে ঠিক বলে চলেছে, দুদিন পর তিয়াসা দেবরায় দার্জিলিং থেকে বালুরঘাট
ট্রাভেল করছিলো সাথে কয়েকজন ক্লায়েন্ট আর কলিগ সিমন্তীনি,
সিমন্তীনির কাছে নানান কথায় জানতে পারে দিপ্ত রায় জামশেদপুরে রায় & রায় বড়ির জামাই, এটা শোনার পর তিয়াসা দেবরায়ের এক অদ্ভুত আগ্রহে জানতে চাইলো দিপ্ত রায়ের স্ত্রীর নাম... আর মিলে গেল যা মেলাতে চাইছিল সে,
ছয় বছর খুব কম সময় নয়, অনেক কিছু বদলে গেছে, তিন্নি অরুনের ছোটো বোন, এখন দিপ্ত রায়ের স্ত্রী তনিমা রায়,
এই কবছরে অরুন একবারমাত্র যোগাযোগ করেছিল....সেটাও ফোনের মারফৎ, বলেছিল ইচ্ছা হলে ফিরতে পার, তিয়াসা ভেবেছিল আরো কিছু বলবে অরুন, আরো কিছুটা আশা করেছিলো ফোনটা পেয়ে, অরুন আর কোন কথা বলার বা শোনার অবকাশ দেয়নি লাইনটা কেটে দিয়েছিলো।
এর একমাসের মধ্যেই তিয়াসা দেবরায়ের দার্জিলিং এর বাড়িতে লিগাল নোটিশ আসে,
অরুন সেপারেশন চায়, আর নোটিশে লেখাছিল টাকা নিজের ইচ্ছেমত নিতে পারো, তিয়াসা অরুন কে টাকায় মাপেনি কখনওই সেদিনও পারেনি, কোনো আর্জি ছাড়াই রাজী হয়ে গেছিলো অরুন কে মুক্তি দিতে কাগজে কলমে।
যে দিন শেষ দেখা ওদের সেদিন অরুন অবাক হয়ে তাকিয়েছিল তিয়ার দিকে, এক দৃঢ় দীপ্ত একটা নারী..... অথচ এই মেয়েটাই একদিন চারদেওয়ালে গৃহীনি ছিল, আর পাঁচটা মেয়ের মত স্বামী সংসার.... আর ভাবতে পারছে না অরুন, মেলাতে পারছে না, সেদিন তিয়া শেষবার বলেছিল ভালো থেকো সাবধানে থেকো। অরুন তিয়ার চোখের দিকে তাকাতে পারেনি পুড়ে যাচ্ছিল কিসের এক আগুনে, বলতে পারেনি তিয়া তুমিও ভালো থেকো।
আজ এত বছর পর সেই আগুন কি নিভে গেছে!
সময় কি আবার দুর্বল করে দিচ্ছে তিয়াসা দেবরায়কে? এত দিনেরশ্রম সবকি নিমেষে নড়ে যাচ্ছে, দিপ্ত রায়ের মুখটা কেনওই বা বার বার ভাসছে চোখের সামনে,
যত বার দিপ্ত রায়ের সাথে দেখা হচ্ছে একটা অন্য বাতাস বইছে তিয়াসা দেবরায়ের চারপাশ দিয়ে, কত ক্লায়েন্ট তো আসে জামশেদপুর থেকে এরকম কখনওই হয়নি, দিপ্তরায় জামশেদপুর থাকে শুনে থেকেই কি এক সুতোর টান তিয়াসা দেবরায় কে নাড়িয়ে দিচ্ছে। এলোমেলো ভাবনায় সব অগোছালো হচ্ছে।
, কাজের শেষে অফিস ফেরত তিয়াসা দেবরায় একটা বৃদ্ধাশ্রমে রোজ যায় জীবনটাকে শেষ দরজায় কেমন লাগে কতো রকমের ছবি এক একজন যাপনকারীর হৃদয়ের দেওয়ালে, তিয়াসা দেবরায় হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখে সেই সব ছবির কোলাজ, এই কয়েকদিন তিয়াসার এই আশ্রমে অনেকটা সময় কাটাচ্ছে, অফিস থেকে সময়ের আগেই বেরিয়ে চা বাগানের রাস্তা ধরে একা একা ভাবনাদের হাতে হাত রেখে আনমনে কখন যেন পৌছে যায় এই 'অবসর ' আশ্রমে , কিছু ভালো লাগছে না ঝড় থামাতেই হবে কিছুতেই অগোছালো হওয়া যাবে না, তাই ব্যস্ততা কে বাড়িয়ে দিয়েছে নিজের জীবনে 'অবসর ' অনেকটা সময় কাটিয়ে রাত আটটার সময় বাড়ি ফিরছে তার পর সমু আর ইমলীর সাথে স্বাভাবিক কিছু কথোপকথন আর একসাথে খাবার খেয়ে ঘুমিয়ে পড়ার বাহানায় এই ছোট্টছোট্ট চোখগুলোর থেকে নিজেকে লুকিয়ে রাখা, রাতভর সিলিঙ ফুঁড়ে কত কথা আকাশ ছুঁতে চায়, আর আকাশটার বেগুনী রঙ সরিয়ে দেখতে চায় শুধু আলো আর আলো....... আরুন নয়, এখন সামনে সমু, ইমলী, কাজ, অবসর, আর লেখা আর একটা মুক্তি। তিয়াসা দেবরায় পেছনে তাকালে যে হোঁচোট খেয়ে পড়তে হবে আর ক্ষত বিক্ষত হতে হবে। তিয়াসা দেবরায় অনেক ক্ষত সারিয়েছে নিজে নিজে তার দাগ হয়তো মুছবে না কিন্তু নতুন করে মনের দুর্বলতা আর সে যে মোটেই প্রশ্রয় দিতে নারাজ। তবুও সময় আসে নিজের ধারায় আর বয়েও যায় নিজের পথে পথিককে সেই ধারায় মিশিয়ে নিতে হয় নিজের চলাটুকু, তিয়াসা দেবরায়ও এই দায়রার বাইরে নয়।
Tuesday, 4 April 2017
কৃষ্ণচুড়া(৩)
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment